বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান, মহেশপুর

হামিদুর রহমান

মোহাম্মদ হামিদুর রহমান (২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩ – ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১)

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ৪নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন, সৈনিক নাম্বার ৩৯৪৩০১৪। যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে শহীদ হওয়া হামিদুর রহমান সাত জন বীর শ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

 
[বীর শ্রেষ্ঠ বীরত্বের জন্য প্রদত্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক। যুদ্ধক্ষেত্রে অতুলনীয় সাহস ও আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপনকারী যোদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই পদক দেয়া হয়েছে । ]

 

জন্ম ও শিক্ষাজীবন
মোহাম্মদ হামিদুর রহমান জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তদানিন্তন যশোর জেলার (বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা) মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রাম। তাঁর পিতার নাম আব্বাস আলী মন্ডল এবং মায়ের নাম মোসাম্মাৎ কায়সুন্নেসা। শৈশবে তিনি খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে হাইস্কুলের নাইট শিফটে ভর্তি হন।

কর্মজীবন
১৯৭০ সালে হামিদুর যোগ দেন সেনাবাহিনীতে সিপাহী পদে। তাঁর প্রথম ও শেষ ইউনিট ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সেনাবাহিনীতে ভর্তির পরই প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে পাঠানো হলো চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে। ২৫ মার্চের রাতে চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ওখানকার আরও কয়েকটি ইউনিটের সমন্বয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে চাকরীস্থল থেকে নিজ গ্রামে চলে আসেন। বাড়ীতে একদিন থেকে পরদিনই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য চলে যান সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই চা বাগানের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ধলই বর্ডার আউটপোস্টে। তিনি ৪নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে হামিদুর রহমান ১ম ইস্টবেঙ্গলের সি কোম্পানির হয়ে ধলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন। সিলেটের সীমান্ত এলাকা শ্রীমঙ্গল হতে দশ মাইল দক্ষিণে ধলই সীমান্ত ঘাঁটি। এরই মধ্যে চা বাগানের মাঝে আস্তানা গেড়েছে পাকহানাদার বাহিনী। মাত্র চারশো গজ দূরে ভারতীয় সীমান্ত। চা বাগানেই বাঙ্কার করে এক শক্ত অবস্থান নিয়ে বসে আছে পাকিস্তানি হানাদাররা। ভোর চারটায় মুক্তিবাহিনী লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌছে অবস্থান নেয়। চারদিকে সুনসান নীরবতা।

সেখানে জেগে আছে মুক্তিবাহিনীর একটি ইউনিট। এই ইউনিটটি ছিল জেড ফোর্সের অধীনস্থ। এই ইউনিটটির ওপরই দায়িত্ব পড়েছে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে ধলই সীমান্ত ঘাঁটি দখল নেয়ার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোরারাতেই আক্রমণ করা হবে ঘাঁটিটি। লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম এ অভিযানের নেতৃত্বে আছেন। সারা রাত চলেছে আক্রমণের প্রস্তুতি। রাতভর পথ চলে ভোরের দিকে ঘাঁটির কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে ইউনিটটি। সবকিছুই হচ্ছে নীরবে-নিভৃতে । হানাদার বাহিনী যেন কিছুতেই টের না পায়। মুক্তিবাহিনীর এই দলটি হানাদার বাহিনীর তুলনায় অনেক ছোট হলে কী হবে- সাহসে দেশপ্রেমে তাঁরা অনেক বড়, অনেক অগ্রগামী।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান এর স্মৃতিসৌধ, কমলগঞ্জ

তাঁদের অস্ত্রশস্ত্রও হানাদার বাহিনী অপেক্ষা যথেষ্ট অনাধুনিক। এই দলেরই তরুণ যোদ্ধা হামিদুর রহমান। যুদ্ধ শুরু হবার মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি যোগ দিয়েছেন সেনাবাহিনীতে৷ দুর্দান্ত সাহসী, দৃঢ়চিত্ত, অসম্ভব পরিশ্রমী এই তরুণ দেশপ্রেমে গরীয়ান। মাঝারি গড়নের সুঠাম দেহের অধিকারী এই তরুণের মনের জোর অসম্ভব। আক্রমণের জন্য তৈরি ইউনিটটি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশ নেয়। সামনে দুই প্লাটুন সৈন্য এবং এক প্লাটুন সৈন্য পেছনে। প্রথম দুই প্লাটুন ডান ও বাঁদিক থেকে ঘাঁটি আক্রমণ করবে। আর পেছনের প্লাটুনটি পেছন থেকে ঘাঁটিটি আক্রমণ করবে। সামনে দু প্লাটুন ও পেছনে এক প্লাটুন সৈন্য অবস্থান নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে শত্রু অভিমুখে।

যেভাবে শহীদ হলেন

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান এর স্মৃতিসৌধ, কমলগঞ্জ

একটি প্লাটুন ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছতেই ঘটে সর্বনাশ। হানাদার বাহিনী আগেই মাইন পেতে রেখেছিল। শত্রু অবস্থানের কাছাকাছি এলে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। মাইন ফেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার দেহ। আহত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লাগলেন। রক্তে রক্তে লাল হয়ে গেল মাটি। কিন্তু এত মৃত্যুর পরও পেছনে হটার কোনো সুযোগ নেই। ঘাঁটি দখল করতেই হবে। এক পর্যায়ে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধারা আরও অগ্রসর হলেন। মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছে পৌছে গেলেও ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত হতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণের জন্য আর অগ্রসর হতে পারছিলো না।

এটি থেকে মুহুমুহু ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসছে বুলেট। এদিকে ঘন গাছগাছালির কারণে মুক্তিযোদ্ধারাও সঠিকভাবে তাঁদের মেশিনগান চালাতে পারছে না। সামনের এগোতে হলে অবশ্যই সেই এলএমজিটা থামিয়ে দিতে হবে। লে. কাইয়ুম সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক ওই এলএমজিটা থামাতেই হবে । তিনি সহযোদ্ধা সিপাহী হামিদুর রহমানকে ডেকে বললেন, “ওই এলএমজিটা থামাতেই হবে। – এ কাজটা তোমাকেই করতে হবে।” সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুত হয়ে গেলেন সিপাহী হামিদুর রহমান। টগবগ করে উঠল শরীরের রক্ত। আদেশ পালনের জন্য তিনি মরিয়া হয়ে ওঠলেন। এখন তাঁর একটাই লক্ষ্য, ওই এলএমজিটা থামাতেই হবে। আঠারো বছরের এক উদ্দীপ্ত তরুণ শপথ করলেন জীবনবাজি রেখে। বিদায়ের সময় মাকে বলে এসেছিলেন, ‘দেশকে শত্রুমুক্ত করে বাড়ি ফিরব’। বুকে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগলেন এলএমজিটার দিকে। বুকের নিচে কঠিন মাটি, ডাইনে-বায়ে-উপরে সমানে চলছে গুলি।

মাটির নিচ থেকে যে কোনো সময় ফুটতে পারে মাইন। উভয় পক্ষের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো গর্জে উঠছে মুহুমুহু। এসব উপেক্ষা করে মৃত্যুকে পরোয়া না করে সিপাহী হামিদুর রহমান এসে পড়লেন একেবারে এলএমজিটার কাছাকাছি। দেখলেন, এলএমজিটার পেছনেই দুজন পাকিস্তানি সেনা। তিনি পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে, কিন্তু তার পরপরই হামিদুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। সে অবস্থাতেই তিনি মেশিনগান পোস্টে যান। পারবেন তো! পারতেই হবে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেন না তিনি। এবার তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন এলএমজি পোস্টের ওপর। এলএমজি চালনায় নিয়োজিত দুই পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে শুরু হলো ধ্বস্তাধস্তি। এভাবে আক্রমণের মাধ্যমে হামিদুর রহমান এক সময় মেশিনগান পোস্টকে অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন। এই সুযোগে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল উদ্যমে এগিয়ে যান, এবং শত্রু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে সীমানা ফাঁড়িটি দখল করতে সমর্থ হন। বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা এলএমজি পোস্টের কাছে দৌড়ে এসে পেলেন শহীদ হামিদুর রহমানের মৃতদেহ। তাঁর পাশেই মৃত অবস্থায় পড়ে আছে দুই পাকসেনা। হামিদুর রহমান বিজয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি।

সমাহিত করা হয় যেভাবে

ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান

হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখন্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।নীচু স্থানে অবস্থিত কবরটি এক সময় পানির তলায় তলিয়ে যায়। ২০০৭ সালের ২৭শে অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করে, এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে শহীদের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে এই মহান বীরের সমাধী

সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাম: মোহাম্মদ হামিদুর রহমান
জন্ম : ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩
জন্মস্থান : তদানিন্তন যশোর জেলার (বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা) মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা : আক্কাস আলী।
মা : কায়ছুন্নেসা।
কর্মস্থল : সেনাবাহিনী।
যোগদান : ১৯৭০ সাল।
পদবী : সিপাহী।
মুক্তিযুদ্ধে অংশরত সেক্টর : ৪নং সেক্টর।
মৃত্যু : ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ সাল।
সমাধিস্থল : মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান।

পুরস্কার ও সম্মাননা
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক বীরশ্রেষ্ঠ পদক দেয়া হয় সিপাহী হামিদুর রহমানকে। এছাড়া তাঁর নিজের গ্রাম ‘খোর্দ খালিশপুর’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হামিদনগর৷ এই গ্রামে তাঁর নামে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়৷ ঝিনাইদহ সদরে রয়েছে একটি স্টেডিয়াম।একটি ফেরিও তাঁর নামে রাখা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে খালিশপুর বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি কলেজ ৷ স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর এই শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর গ্রামে লাইব্রেরি ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৷ ১২ জুন ২০০৭ সালে এই কলেজ প্রাঙ্গণে ৬২ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে শুরু হয় এই নির্মাণ কাজ৷

২০১৬ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (টিএসসিসি) নাম পরিবর্তন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান কেন্দ্রীয় মিলনায়তন নামকরণ করা হয়েছে।

 

 

তথ্যসূত্রঃ
১. https://bn.wikipedia.org/s/93l
২. http://www.bangladesh.gov.bd/
৩. https://bn.wikipedia.org/s/286h
৪. https://bn.wikipedia.org/s/ljx
৫. মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বিভিন্ন গবেষনাপত্র।